আধুনিকা বনাম প্রগলভ

 আধুনিক আর প্রগলভ এই দুটি শব্দ সমলিঙ্গে বেশ আলাদা হলেও আধুনিকা ও প্রগলভ শব্দদুটিকে বেশ কয়েকপ্রকারে অর্থগতভাবে সমঞ্জস হিসেবে দেখানো যেতে পারে। যদিও আধুনিকাদের প্রগলভতা যা নিয়ে বর্তমানে নব্য পুরুষ তথা পৌরুষবাদীরা বেশ সোচ্চার, তা এই লেখার উপজীব্য নয়। লেখার শুরুতে ব্যবহার করা দুটো শব্দের মাঝের সংযোজক অব্যয়ের ব্যবহার খানিকটা অশুদ্ধ হয়ে যাওয়াতেই এই বিপত্তি। সেটাকে বদলে ফেলতে পারলে হয়ত লেখাটা বেশ শুরু থেকে শুরু করা যেতে পারত। তবে, সংস্কৃতির ঐতিহ্যে পাঠকের মনের আকাশে গৌরচন্দ্রিকার চন্দ্রোদয় না হলে পাঠকের সঙ্গে লেখকের মধুচন্দ্রিমা-টা মাঠে মারা যায়, তাই এতগুলো বাড়তি অক্ষরের অবতারণা। এই লেখার শিরোনাম হওয়া উচিত “আধুনিকা বনাম প্রগলভ”। শেষ পর্যন্ত তাই-ই হয়ত হবে। কেননা তাহলেই একমাত্র পাঠকের কাছে পড়ার আগেই লেখার বিষয়টা একটা ঝাপসা হলেও অবয়ব পাবে। 


গোড়াতেই আধুনিকা বিষয়টা নিয়ে একটু কাটাছেঁড়া করা যাক। নারীবাদীরা এই কাটাছেঁড়ায় ধর্ষকাম ইত্যাদি খুঁজে পাওয়ার আগেই সে আলোচনা শেষ করতে হবে আর সেই সঙ্গে দিতে হবে লেখকের কৈফিয়ৎ। কলমের আগায় যতটুকু ধার, তাতে কোন রমণীর বস্ত্রহরণ ফন্দি শানায় না। আমার কাজ শুধুই অক্ষর নিয়ে, আক্ষরিকভাবেই। 



অতঃপর প্রশ্ন হল, সখী, আধুনিকা কারে কয়, তারা কতেক মহিমাময়! আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধিবলে যা বলে, তা হল— আধুনিকা সে-ই; যে পৌরুষেয় সমাজে লুন্ঠিতা নয়, পুরুষের সঙ্গে কোঁদল করতে কুন্ঠিতা নয় এবং যে কোন প্রতিকূলতায় (মায় প্রখর দাবদাহ বা দুর্দম শৈত্য) কোনমতেই অবগুন্ঠিতা নয়। কাজেই এ হেন বিস্ফোরক চরিত্র নিয়ে আলোচনা করার আগে সচ্চরিত্রতার double check বড়ই প্রয়োজন, আর প্রয়োজন দারুণ সতর্কতার। যদিও রবিঠাকুর নিদারুণ সত্যে বলেছিলেন, ‘সাবধানের যেমন মার নেই, তেমব মারেরও আবার সাবধান নেই’’। সেই আপ্তবাক্যে হাল ধরে, পাল খুলে এই মারের সাগর পাড়ি দেবার চেষ্টা আপাতত। 



উল্লিখিত এ হেন আধুনিকা একজন পুরুষকে যা খুশি বলতে পারেন। মায় প্রেমে কাঁদানো থেকে ফ্রেমে বাঁধানো পর্যন্ত তার অবাধ স্বাধীনতা। যে কোন প্রস্তাবেই এক এবং একমাত্র তার আধুনিকতাই প্রকাশিতব্য। অন্য যে কোন সম্ভাবনাই নিতান্ত অসম্ভব। এ ব্যাপারটা যুক্তি-সওয়া না হলেও বেশ গা-সওয়া হয়ে উঠেছে দীর্ঘ অভ্যেসে। তাই তাতে নতুন করে দুঃখ বিদ্রোহ ইত্যাদির চাগাড় আসে না। কিন্তু নিয়মিত-র অভ্যেসে প্রশ্নগুলো সহজ হলেও উত্তর অজানা। ভুল অনুবাদের আশঙ্কায় তার ভার বেড়েছে এতই, যে বাতাসে ভাসমানতার ব্যাপারটা তর্কসাপেক্ষ। এই পরম বিপর্যয়ের মুহূর্তেই হানা দেয় প্রগলভতার প্রশ্নচিহ্নটা। আধুনিকা সম্পাদিত প্রশ্নবিচিত্রার সম্ভাব্য উত্তরপত্রের সবচেয়ে বড় সমস্যা এটাই, যে সে উত্তর প্রশ্নকর্ত্রীর ইচ্ছামাত্রেই প্রগলভতা হয়ে ওঠে। তার এই মেরুকরণ তার অনুমতি ছাড়াই হয়, হয়ে যায়। আর যদি সে তাতে আপত্তি করে তবে তাকে রক্ষণশীলতার লেবেল সেঁটে ছুঁড়ে দেওয়া হয় অবহেলার চুল্লিতে। অতএব কী করণীয় এই ডিলেমায় যদি সে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘এ ডিলেমা, কেন দিলে মা?’ তবু তার সুরাহা হয় না। ব্রাত্য হবার পর সে বুঝতে চায়, সে যবন না কি কাফের! সে ভয় পায়, বেঁচে থাকতে, কথা বলতে, ঘুমোতে, খেতে। সে ভয় পায় কারণ তার যে কোন গ্রাস-ই আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারে সত্যাসত্যের তোয়াক্কা না করেই। ঐচ্ছিক হবার ভয়ে সে ইচ্ছুক হতে পারে না। উত্তর খুঁজতে সে ছুটে যায় দক্ষিণে, পশ্চিমে, পুবে… 

Comments

Popular posts from this blog

হারিয়ে খুঁজি তোমায়; তোমার মত

চড়ুকে পিঠ (পর্ব-৪)— ত্রিপুর রাজার বিনা নিমন্ত্রণে