রয়েছ তুমি, এ কথা কবে, জীবনমাঝে সহজ হবে!


 

ঘটনাচক্রে সমুদ্রের কাছেই ফিরে গেলাম আবারও। একে ছন্দোবদ্ধ সমাপতন বলা যায় কি না জানা নেই। তবে এটুকু জানি, এ সমাপতনের ছন্দপতন যদি হবার হয়, তবে তা নিজে থেকেই হবে, আমার তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। অভ্যেসের নোনাধরা যাপন থেকে ছুটি নিয়ে কেমন করে বা কোন ঘটনাপ্রবাহের টানে নোনা জল-হাওয়ার দেশে গিয়ে পড়েছিলাম, সে বর্ণনায় কাজ নেই। তার চেয়ে বরং এই আপাত স্থবির জীবনে অগুণতি ঢেউ-এর আঁচড়ে যে বিচিত্র ছবি ফুটে উঠল, তার কথা বলা যাক।

সতত সঞ্চরণশীল এই বিরাট এর মুখোমুখি হতে পারাটাকে আমি খুব সহজ কাজ বলে ভাবতে পারি না, পারিনি কোনকালেই। বহমানতা, গতিশীলতার সেই বিরাট নজির-এর সামনে স্থবিরতা, অনড়তার কোন স্থান নেই। ঢেউ-এর পৌনঃপুনিক আঘাত, পায়ের নীচে বালির আস্তরণের ক্রমশ বিশ্বাসঘাতকতা যেন সজোরে ঘোষণা করে যায় অনড়ের বিপদসঙ্কেত। যে জাহাজ বন্দরে নোঙ্গর ফেলেছে, স্থিরতার আশ্বাস তারও নেই। মনে হল জীবনের ফসলের যে উদ্বৃত্তে যাপনের গোলা বোঝাই করছি, করে চলেছি, সেসব অচিরে ঝেড়ে ফেলতে না পারলে এ অতলে তলিয়ে যেতে হবে, তল পাব না মোটেই। কাজ-অকাজের যে অপ্রাসঙ্গিক স্তূপ আমার দৃষ্টিপথে উদ্ধতের মত জমা হয়ে ঢেকে দিচ্ছে, আটকে দিচ্ছে আমার দৃষ্টির বিনয়ী অবকাশ, সত্যের আলো, তাকে এখুনি আলগা করতে না পারলে জীবনটা আর শ্বাস নিতে পারবে না সহজে। সে নিজেও মরবে, ছাড়বে না আমাকেও।

দিনান্তের ম্লান আলোয় অগণ্য আগ্রাসী ঢেউ-এর হাতছানি, আস্ফালন শুনে মনে হল এই বুঝি ঈশ্বরের ভাষা, সে ভাষা অবোধ্য হয়েও নিতান্ত সহজ। ঈশ্বর সে-ই যার অস্তিত্বের প্রকাশমাত্রেই মিথ্যে হয়ে যায় সমস্ত ভড়ং, সব সারগর্ভ আস্ফালন। ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার যে কাঠামোকে ভিত্তি করে, লতিয়ে উঠেছে আমার প্রাত্যহিক যাপন, তাকে এক মুহূর্তে বড় অসহ্য, দুর্বহ বলে মনে হল যেন। ইচ্ছে হল, ফেলে আসি সেসব, সেখানেই। অদৃশ্য এ ভার-এর কমা-বাড়া শালগ্রামের শোওয়া-বসার মতই, বোঝা যায় না। তাই এ বোঝা নামল কি না, তা প্রত্যয় করার কোন স্থূল উপায় নেই। তবু, যেন মনে হয়, যতখানি নিয়ে গেছিলাম, ফিরেছি, তার চেয়ে কিছু কম নিয়ে। আর সেই কমতিটুকু ভরাট করেছে একটাই প্রত্যাশা-

“রয়েছ তুমি এ কথা কবে,’

জীবনমাঝে সহজ হবে,

আপনি কবে তোমারই নাম

ধ্বনিবে সব কাজে…”

Comments

Popular posts from this blog

আধুনিকা বনাম প্রগলভ

দেবীপক্ষে; দেবীর পক্ষে

চড়ুকে পিঠ (পর্ব-৪)— ত্রিপুর রাজার বিনা নিমন্ত্রণে