Posts

রয়েছ তুমি, এ কথা কবে, জীবনমাঝে সহজ হবে! (চড়ুকে পিঠ পর্ব-৫)

Image
  ঘটনাচক্রে সমুদ্রের কাছেই ফিরে গেলাম আবারও। একে ছন্দোবদ্ধ সমাপতন বলা যায় কি না জানা নেই। তবে এটুকু জানি , এ সমাপতনের ছন্দপতন যদি হবার হয় , তবে তা নিজে থেকেই হবে , আমার তা নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। অভ্যেসের নোনাধরা যাপন থেকে ছুটি নিয়ে কেমন করে বা কোন ঘটনাপ্রবাহের টানে নোনা জল-হাওয়ার দেশে গিয়ে পড়েছিলাম, সে বর্ণনায় কাজ নেই। তার চেয়ে বরং এই আপাত স্থবির জীবনে অগুণতি ঢেউ-এর আঁচড়ে যে বিচিত্র ছবি ফুটে উঠল, তার কথা বলা যাক। সতত সঞ্চরণশীল এই বিরাট এর মুখোমুখি হতে পারাটাকে আমি খুব সহজ কাজ বলে ভাবতে পারি না, পারিনি কোনকালেই। বহমানতা, গতিশীলতার সেই বিরাট নজির-এর সামনে স্থবিরতা, অনড়তার কোন স্থান নেই। ঢেউ-এর পৌনঃপুনিক আঘাত, পায়ের নীচে বালির আস্তরণের ক্রমশ বিশ্বাসঘাতকতা যেন সজোরে ঘোষণা করে যায় অনড়ের বিপদসঙ্কেত। যে জাহাজ বন্দরে নোঙ্গর ফেলেছে, স্থিরতার আশ্বাস তারও নেই। মনে হল জীবনের ফসলের যে উদ্বৃত্তে যাপনের গোলা বোঝাই করছি, করে চলেছি, সেসব অচিরে ঝেড়ে ফেলতে না পারলে এ অতলে তলিয়ে যেতে হবে, তল পাব না মোটেই। কাজ-অকাজের যে অপ্রাসঙ্গিক স্তূপ আমার দৃষ্টিপথে উদ্ধতের মত জমা হয়ে ঢেকে দিচ্ছে, আটকে দিচ্ছ...

আধুনিকা বনাম প্রগলভ

 আধুনিক আর প্রগলভ এই দুটি শব্দ সমলিঙ্গে বেশ আলাদা হলেও আধুনিকা ও প্রগলভ শব্দদুটিকে বেশ কয়েকপ্রকারে অর্থগতভাবে সমঞ্জস হিসেবে দেখানো যেতে পারে। যদিও আধুনিকাদের প্রগলভতা যা নিয়ে বর্তমানে নব্য পুরুষ তথা পৌরুষবাদীরা বেশ সোচ্চার, তা এই লেখার উপজীব্য নয়। লেখার শুরুতে ব্যবহার করা দুটো শব্দের মাঝের সংযোজক অব্যয়ের ব্যবহার খানিকটা  অশুদ্ধ হয়ে যাওয়াতেই এই বিপত্তি। সেটাকে বদলে ফেলতে পারলে হয়ত লেখাটা বেশ শুরু থেকে শুরু করা যেতে পারত। তবে, সংস্কৃতির ঐতিহ্যে পাঠকের মনের আকাশে গৌরচন্দ্রিকার চন্দ্রোদয় না হলে পাঠকের সঙ্গে লেখকের মধুচন্দ্রিমা-টা মাঠে মারা যায়, তাই এতগুলো বাড়তি অক্ষরের অবতারণা। এই লেখার শিরোনাম হওয়া উচিত “আধুনিকা বনাম প্রগলভ”। শেষ পর্যন্ত তাই-ই হয়ত হবে। কেননা তাহলেই একমাত্র পাঠকের কাছে পড়ার আগেই লেখার বিষয়টা একটা ঝাপসা হলেও অবয়ব পাবে।  গোড়াতেই আধুনিকা বিষয়টা নিয়ে একটু কাটাছেঁড়া করা যাক। নারীবাদীরা এই কাটাছেঁড়ায় ধর্ষকাম ইত্যাদি খুঁজে পাওয়ার আগেই সে আলোচনা শেষ করতে হবে আর সেই সঙ্গে দিতে হবে লেখকের কৈফিয়ৎ। কলমের আগায় যতটুকু ধার, তাতে কোন রমণীর বস্ত্রহরণ ফন্দি শানায় না। আমার কাজ ...

হারিয়ে খুঁজি তোমায়; তোমার মত

হৈম ন্তী গল্পে রবীন্দ্রনাথ কথকের মুখে বলেছিলেন, “দানের মন্ত্রে স্ত্রী-কে যেটুকু পাওয়া যায়, তাহাতে সংসার চলে কিন্তু পনেরো আনা বাকি থেকে যায়”। গল্পকার এই পর্যন্ত বলেই শেষ করেছিলেন এ প্রসঙ্গ, এর চেয়ে ফেনিয়ে বলতে হয়ত তাঁর রুচিতে বেধেছিল, অথবা তিনি ভরসা করেছিলেন, স্বজাতির ওপর, তাদের বোধের ওপর৷ তাঁর এই ভরসা যে কতখানি ভিত্তিহীন ছিল, তা যখন তিনি বুঝেছিলেন, তখন অনেকখানি দেরি হয়ে গিয়েছিল। ঠাকুর পদবীর জোরে(?) যখন মানুষ রবীন্দ্রনাথ দেবতা হয়ে উঠলেন, তখন আর কিছুতেই তাঁর মানুষ হবার উপায় রইল না। তিনি নিজেই লিখেছিলেন, “ধর্মের বেশে মোহ এসে যারে ধরে, অন্ধ সেজন মারে আর শুধু মরে”— এই লেখা তাঁর নিজের ক্ষেত্রেই এতখানি সার্থক হয়ে উঠবে জানলে হয়ত একটা প্রতিকারের বা অন্তত পালানোর পথ ভেবে রাখতেন। নজরুল নিজেকে “হুজুগের কবি” বলে পরিত্রাণ পেতে চেয়েছিলেন, সেরকমই কোন কাব্যিক উপায় হয়ত রবীন্দ্রনাথও জোটাতেন। না হলে “দেখলে গতিক মন্দ” ডুবতেন অগাধ জলে, তেমনি করেই কাটিয়ে দিতেন, “লুকোচুরির ছলে”৷ রবীন্দ্রনাথের মানুষী অস্তিত্বের বিলোপসাধনের সঙ্গে সঙ্গে যে বিষয়টি মারক হয়ে ওঠে, তা হল তাঁর এবং তাঁর সৃষ্টির ভুল তথা অক্ষম অনুবাদ। রব...

দেবীপক্ষে; দেবীর পক্ষে

শাক্ত কবি যখন আবেগতাড়িত হয়ে হিমালয়-জায়ার বয়ানে লিখলেন, "এবার আমার উপায় এলে আর উমা পাঠাব না"— মনের গভীরে তিনি জানতেন এ কেবলই কথার কথা। বাস্তবে, সামাজিক চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে উমার পিতৃগৃহে দীর্ঘ প্রবাস সম্ভবপর হবে না কোনমতেই। তাই দেবীপক্ষের শুরুতে যে প্রতিরোধ অলঙ্ঘ্য বলে মনে হয়েছিল, সে প্রতিরোধ দুর্বলতর হতে হতে দিনের শেষে ঘাড় ধাক্কার রূপ পরিগ্রহ করে। "যেও না নবমী নিশি" — মর্মে মেনকা যতই কাঁদাকাটা করুন না কেন, তিনি নিজেও এ কথা জানতেন, যে নবমীর রাত পোহালে যদি তার মেয়ে শ্বশুরবাড়িমুখো না হয়, তবে তার মেয়ের বধ করা সমস্ত অসুর সামাজিকতার অব্যর্থ বরে বেঁচে ওঠে তার চারপাশে বর্বর নৃত্য আরম্ভ করবে এবং তার মেয়ে দশ হাতেও সমাজের পাঁচ কান বন্ধ করতে পারবে না। বোধনের বাজনার গভীরে যে বিসর্জনের প্রস্তুতি চলে, এই রূঢ় সত্যকেই কোমলতার কিংখাবে ঢাকতেই এত কথা, এত গান, এত গল্প আর এত আয়োজন। এত মলাটের প্রয়োজন এই কারণেই। দিনশেষের গলা ধাক্কায় মেয়ের ঘাড় ভেঙে যায় যাক ক্ষতি নেই, কিন্তু তার হৃদয় যেন অক্ষত থাকে। ভগ্নহৃদয়ে সে শ্বশুরবাড়ী গেলে সেখানে বাপের বাড়ীর নিন্দে হবে। এই দ্বি-চা...

বাস করিনি কোথাও

শাস্ত্রকারেরা যতই দেবভাষায় স্বর্গ কাঁপিয়ে হুঙ্কার করুন যে, এ জীবন কিছুই নয়, ক্ষণকালের মায়ামাত্র— তারা নিজেরাও একথা ভালই বুঝতেন যে, এই মায়ার ছায়ার বাইরে বেরিয়ে যাওয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। আর সেই ছায়ায় বসবাস করতে যা কিছু, যত কিছু প্রয়োজন হয়— তার আয়োজন করতেই এ জীবনের নাভিশ্বাস উঠে যেতে পারে কুলকুণ্ডলীনী ছেড়ে একেবারে সহস্রারে।  এই অসীম প্রয়োজনের তালিকার একেবারে গোড়ার দিকের তিনটি জিনিস— অন্ন বস্ত্র ও বাসস্থান। প্রথম দুটোর দায়িত্ব নেওয়া বা অন্যের ওপরে শাস্ত্রমতে চাপিয়ে দেবার সামাজিক বিধান হয়ত রয়েছে কিন্তু গোল বাধে তৃতীয়টিকে নিয়েই।  জন্মসূত্রে বা বলা ভালো উত্তরাধিকার সূত্রে যারা বাসস্থানটি অন্ন-বস্ত্রের সঙ্গে মুফতে পেয়ে যান,  তারা স্বভাবতই যাপনের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় এই বস্তুটির সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন না। আর যাদের ভাগ্যে ভিক্ষের দানে অচল পয়সা, অর্থাৎ যারা পুরুষানুক্রমে বাস্তুহারা, তাদের কাছে দুঃখের, গ্লানির, যন্ত্রণার চক্রবৃদ্ধি সুদে তার আসল দাম বেড়ে হয় অমূল্যের সামিল। সেসব মানুষের আজীবনের অপ্রাপ্তি হতাশার পৌনঃপুনিকে জারিত হয়ে জন্ম নেয় নানা বিকৃত ভাবনা। ...

চড়ুকে পিঠ (পর্ব-৪)— ত্রিপুর রাজার বিনা নিমন্ত্রণে

Image
  দমদম বিমানবন্দর। জাতিগত ঐতিহ্য ধূলিসাৎ করে নির্ধারিত সময়ের অনেকটা আগে, মায় যার জোরে আমি উড়ব (না, সে আমার রাজনৈতিক আত্মীয় বা ওই গোছের কেউ নয়) তারও আগে বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। সাইনবোর্ডে কলকাতার এবং তদীয় সংস্কৃতির ঢাক তেরেকেটে তাক তাক দেখতে দেখতে ঢুকে পড়লাম বোর্ডিং পাশ জোগাড়ের লাইনপাশে! সর্পিল উন্নয়ন পেরিয়ে যখন কাউন্টারে আসীন বিপত্তারণের কাছে পৌঁছলাম, দেখি তিনি সংগত কারণেই ভারি ব্যস্ত। তাকে বিব্রত করার চেষ্টা যথাসম্ভব না করে মোলায়েম গলায় কথা বলার চেষ্টা করতেই বুঝলাম, আমার মাতৃভাষার ক্যার্দানি এখানে খাটবে না। রাষ্ট্রভাষায় (যদিও ব্যাপারটা অস্তিত্বহীন) আমার দখল উদ্বাস্তুর সামিল। কাজেই ইংরেজিই ভরসা। ব্যকরণ-কে নেহাত অকারণ জ্ঞানে ছেঁটে ফেলে তিনি আমায় যা বললেন, তা আমার যৎসামান্য বোধে কষ্টেসৃষ্টে কুলিয়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম বৈকুন্ঠধামের ১০৪ নম্বর দরজা আমার জন্যে বরাদ্দ হয়েছে।  বোর্ডিং কার্ডের বদান্যতায় নিরাপত্তা বলয় পার করে যখন অপেক্ষার পালা এল, প্রকৃতির ডাকে অল্পেকটু সাড়া দিয়ে একটু হাঁফ ছাড়তে পারলাম। এবার অপেক্ষার পালা, কারণ এখনও আমার সময় হয়নি। আর এই কথা আমি ছাড়াও অনেকে জানে সম্ভবত...

কবিতার অনুবাদ: কবির যাপনান্তর

ক বিতার অনুবাদ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন— "a poem cannot be translated, it can only be re-lived in a different atmosphere"। এই মন্তব্যকে যদি সত্যি বলে মেনে নিই আর সেইসঙ্গে কবি ও কবিতার যদি একটি অভেদ কল্পনা করি তাহলে যে প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে তা হল, কবিতার অনুবাদ যদি অসম্ভব হয়, তার সময়োচিত সংস্কারের একমাত্র পথ যদি হয় তার যাপনান্তর, তাহলে কবির ক্ষেত্রেও কি সেই একই সূত্র প্রযোজ্য হবে? তাকেও কি সময়ের বা দেশকালের ব্যবধানে সংস্কার করে নিতে হবে প্রাসঙ্গিকতার মাপকাঠিতে? কবিতার অন্তরে কবির যতটুকু যাপন বন্দী হয়ে থাকে, সেই যাপনেরই শরিক হয়ে ওঠেন পাঠক। দেশ-কাল-সময়ের ব্যবধানে কবির সঙ্গে পাঠকের সেখানে যতটুকু ব্যবধান, সেই শূন্যস্থান পূরণেই মধ্যস্থতা করে অনুবাদ। তাই অনুবাদকে বলা চলে কবি ও কবিতার সময়োচিত সংস্কার। অতঃপর প্রশ্ন আসে, সংস্কার আসলে কী? আর কবিতা বা কবির সংস্কার আদপেই কেন প্রয়োজন? জৈমিনি সূত্রে বলা হয়েছে, "সংস্কারো নাম স ভবতি, যস্মিন। জাতে পদার্থ ভবতি যোগ্যঃ কস্যচিদ অর্থস্য।।"। এক্ষেত্রে যে যোগ্যতার প্রশ্নটি উঠে এসেছে তার ব্যাখ্যা শাস্ত্রকার কুমারিল ভট্টের মতে ...

অকাল-বোধনের প্রথম সকাল

দেশ-কালের সীমানা পেরিয়ে বাঙালির যাপনের সঙ্গে সবচেয়ে সম্পৃক্ত যে উৎসব, তা দুর্গাপূজা। এতে শুধু এবং শুধুমাত্র বাঙালিরই একচেটিয়া অধিকার। সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত 'জাতিস্মর' ছায়াছবির শেষাংশেও দেখা যায় কুলপতি নিদান দিচ্ছেন, দুর্গাপূজা বাঙালির উৎসব, অবাঙালি 'ম্লেচ্ছ'র তাতে অধিকার নেই। সমাজপতির নির্দেশে তাই 'যথেচ্ছাচার'-এ প্রাণ দিতে হয় অ্যান্টনি কবিয়ালের স্ত্রী সৌদামিনী-কে। অতঃপর প্রশ্ন আসে, নদী থুড়ি দুর্গাপূজা, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী-তে। ভারত-ভাগ (১৯৪৭) হতে তখনও ৩৬৫ বছর বাকি আর বাংলাদেশের জন্মলগ্ন (১৯৭১) আসতে বাকি আরও ২৪ বছর।  তখন এ-পার আর ওপারের মধ্যে কেবল ভৌগোলিক দূরত্বই ছিল, পাসপোর্ট-ভিসা নবতর সংযোজন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে সৃষ্টির আদিতে কৃষ্ণ বৈকুন্ঠের মহারাসমন্ডলে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ অসুরের ভয়ে দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজা করেন প্রজাপতি ব্রহ্মা, তৃতীয়বারে ত্রিপুর অসুর দমনের কালে দেবী পূজিতা হন শূলপাণি শিবের দ্বারা, চতুর্থবার দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষীকে হারিয়ে ইন্দ্র দেবীর পূজা করেন। দেবীভাগবতপু...

রবি-কে যাবে না পাওয়া, 'কবি'র চরিতে

ছিন্নপত্রের একেবারে শুরুতে রবীন্দ্রনাথের যে লেখা ভূমিকারূপে সংযুক্ত এবং প্রকাশিত, তাতে তিনি লিখছেন— "যখন মনে জানি আমার পাঠকেরা আমাকে ভালো করে জানে না, আমার অনেক কথাই তারা ঠিকটি বুঝবে না এবং নম্রভাবে বোঝার চেষ্টাও করবে না, এবং যেটুকু তাদের নিজের মানসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলবে না সেটুকু আমার ওপরে বিশ্বাস স্থাপন করে গ্রহণ করবে না— তখন মনের ভাবগুলি তেমন সহজে ভাষায় প্রবাহিত হতে চায় না এবং যতটুকু প্রকাশ হয় তার মধ্যে অনেকখানি ছদ্মবেশ থেকে যায়। এর থেকেই বেশ বুঝতে পারি, আমাদের সবচেয়ে যা শ্রেষ্ঠ প্রকাশ সে আমরা কাউকে নিজের ইচ্ছা-অনুসারে দিতে পারি নে। আমাদের ভিতরে সব চেয়ে যা গভীরতম উচ্চতম অন্তরতম সে আমাদের আয়ত্তের অতীত; তা আমাদের দান-বিক্রয়ের ক্ষমতা নেই.….।" রবীন্দ্রনাথের এই উক্তি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে সাহিত্যের ছদ্মবেশের আড়ালে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ তার পাঠকের কাছে বহুলাংশেই অধরা। তার জন্মের ১৬১ বছর এবং মৃত্যুর ৮১ বছর পরেও তাকে নিয়ে গবেষণা আলোচনা বিশ্লেষণ শেষ হয়নি সারা বিশ্বের। তবু যদি প্রশ্ন আসে এত আলোচনা পর্যালোচনার শেষে আদপে কতটুকু চিনেছি তাকে? ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কতটুকুই বা...

শহুরে অন্ধকার না কি নাগরিকার অন্তরাল? যথা দেখিতং তথা লিখিতং; রাতের কলকাতা

হেমেন রায় লিখেছিলেন, "জাল জুয়াচুরি মিথ্যেকথা, এই তিন নিয়ে কলকাতা। লেখক স্বনামখ্যাত হয়েও স্বনামে এমন কথা লেখার সাহস তিনি দেখাননি। আড়াল আবডালের প্রসঙ্গ এলেই অবধারিতভাবে যে চরিত্রটি আমাদের চোখের সামনে এসে পড়ে তিনি রামায়ণ (কু)খ্যাত ইন্দ্রজিত। যিনি আরেকটু হলেই প্রিভিলেজড দেবতাপক্ষকে ল্যাজেগোবরে করে দিতেন, নেহাত দেবতাদের বকলমে বাল্মিকী এসে পরিত্রাণ করলেন। নাগরিক সমাজে বাস করে এমন চোখা মন্তব্য অন্তত স্বনামে করলে তাকেও যে ল্যাজেগোবরে হতে হবে, এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত হেমেন রায় ছদ্মনাম নেন মেঘনাদ গুপ্ত। গোপনীয়তাটা লেখক পদবিতেও রক্ষা করেছেন অসামান্য মুন্সিয়ানায়। যদিও ব্যোমকেশ থুড়ি শরদিন্দু-র মতে বাঙালিরা ছদ্মনাম নিলেই পদবিতে গুপ্ত লেখে। সেদিক থেকে দেখলে হেমেনবাবু এ-যুগে জন্মালে সেরা বাঙালির নমিনেশন পেতেন। রবীন্দ্রনাথ ঘুম ভেঙে যতই দেখুন, কলিকাতা আছে কলিকাতাতেই; বাস্তবে তেমনটা হয়নি। রবীন্দ্রনাথকে মিথ্যে করে সুমন গাইলেন, " পালটায় মন, পালটায় চারপাশ, রাস্তায় আসে নতুন রুটের বাস"। এই সূত্র ধরেই কলকাতাও পাল্টেছে। পাল্টেছে তার নৈশ যাপন। হেমেনবাবুকে হারিয়েছি আমরা, কলকাতা হারিয়েছে রাজধানীর মর্যাদ...

চড়ুকে পিঠ (পর্ব ৩) মন্দারমণি

Image
মন্দার এবং মণি-র মণিকাঞ্চন যোগ ঘটলেই আরামপ্রিয় বাঙালির ফুর্তির প্রাণ ব্রিগেডের ময়দান হয়ে যায়। 'উতলা পরাণে বোতল মুখে, মাছভাজা সনে খাইব সুখে'— এটাই যেন মন্দারমণি-মুখী পর্যটকদের এক ও অদ্বিতীয় শ্লোগান। এর বাইরে আরও কোন মণি-মুক্তো মন্দারে চাপা পড়ে আছে কি না, সেটা খুঁজতেই সকাল সকাল বেলঘরিয়া বাস ডিপো থেকে দীঘাগামী বাসে (টিকিট মূল্য ১৪৫ টাকা) চেপে বসেছিলাম। দারুণ ঝাঁকুনি আর নিদারুণ গরম (কেননা বাসটির শীতাতপ বৈশাখী অনাসৃষ্টিতে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছিল) ঘন্টাচারেক সইবার পর চাউলখোলায় নেমে চাউল ছাড়াই খোলা হাওয়া খেলাম। তারপর অটো-যোগে ১৫০ টাকা গুণে দিয়ে পৌঁছলাম অস্থায়ী বাসায়। নাম 'মনসুন রিসর্ট'। বরাতে না থাকলেও রিসর্টে মনসুন দেখে কিছুটা আশার সঞ্চার হল। দু-পাশে সারিবাঁধা কটেজ-সদৃশ ঘর। মাঝের রাস্তা গিয়ে মিলেছে একটা সাঁকোতে, যা পার হলেই অগস্ত্য যাত্রা থুড়ি সমুদ্রযাত্রার পথ সুগম হয়। বানরসেনা সমুদ্রে যে সেতু বেঁধেছিলেন এবং যা নিয়ে মধুকবি মধুহীনভাবে ঠুকেছিলেন সমুদ্রকে, এই সাঁকো তারই অংশবিশেষ কি না, বহু চেষ্টা করেও জানা যায়নি। সমুদ্রতটের ওটুকু অংশ রিসর্টের বাসিন্দা-দের জন্যেই বিশেষরূপে সুগম; ...

কেশনগরের দুগ্গোপুজো

Image
"রূপং দেহি, ধনং দেহি, জয়ং দেহি, দ্বিষোজহি"- এই প্রার্থনা যাকে প্রতিবছর বুঝে এবং না বুঝে জানিয়ে আসছি, তিনি মহামায়া দেবী দুর্গা। দেবী বলা হয়ত ঠিক হল না, তিনি আপামর বাঙালির ঘরের মেয়ে। বহুদূরের শ্বশুরঘর থেকে মাত্র পাঁচদিনের ছুটিতে প্রতিবছর বাপের বাড়ী আসেন তিনি।  দূরে বিয়ে হয়ে চলে যাওয়া মেয়ে বৎসরান্তে বাড়ী ফিরলে তাকে নিয়ে যে যে আদিখ্যেতা করা সম্ভব বাপ-মা এর পক্ষে, তার সবেরই শাস্ত্রীয় নিদান আছে দুর্গাপুজার আচারে। সবার মঙ্গলার্থে যেদিন থেকে এই বাঙালির ব্যক্তিগত আনন্দটিকে কর্পোরেট তথা সরলার্থে বারোয়ারি করে ফেলা হয়েছে, তবে থেকেই হারিয়ে গেছে মা-মেয়ের খুনসুটিগুলো। কলকাতা থেকে নামমাত্র দূরত্বে নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়-এর নামে এই উপশহরটির জন্ম ও বিকাশ। কৃষ্ণনগর বিখ্যাত তার মৃৎশিল্পের জন্যে। তাই মৃন্ময়ী যে সেখানে অপরূপা হবেন, তাতে সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে না। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন বৈষ্ণব, অথচ তার অনুরাগ ছিল মাতৃশক্তিতে। তাই শাক্তমতে প্রচলিত পূজা-পদ্ধতিতে বৈষ্ণবীয় সংশোধন করে তিনি দুর্গাপুজো শুরু করেন। তবে শুধু রাজা কৃষ্ণচন্দ্রই নন, কৃষ্ণনগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এমনই আরও অ...

চড়ুকে পিঠ (পর্ব ২) রাঁচি-রাজারাপ্পা

Image
 "পাগলাগারদ কোথায় আছে" তা মৌচাক ছায়াছবির এই বিখ্যাত গানটি শোনার পর সকলেই জেনে গিয়েছেন। তবে রাঁচি মানেই শুধু পাগলাগারদ নয়। রোব্বারে খাসি আর সুদূরের পিয়াসী এই দুয়ের ফারাক যদি আপনার জানা থাকে, তবে একবার ঘুরে আসতেই পারেন ঝাড়খন্ডের এই ছোট্ট শহরে। ভিজে জবজবে পশ্চিমবঙ্গীয় স্বত্ত্বা খানিকটা হলেও শুকোনো যেতে পারে এই অছিলায়। পাথুরে টিলা আর তার ফাঁক-ফোকর গলে বেরিয়ে আসা জলের ধারা, মসৃণ পাথরের আলগা প্রান্তে শ্যাওলার টিকে থাকার লড়াই আপনাকে জীবনযুদ্ধে অণুপ্রাণিত করতে পারে। যদিও স্থানীয় মানুষের মতে রাঁচি ভ্রমণের আদর্শ সময় শীতকাল, তবে এই ব্লগের লেখক আপনাকে উপদেশ দেবে বর্ষায় যেতে। সীতা, জোনহা, হুন্ড্রু জলপ্রপাতের পূর্ণ যৌবন দেখার জন্যে এর থেকে ভাল সময় হয় না। জলপ্রপাতে কৃত্রিম যে স্নানাগার আছে, তাতে জলকেলিটা অবশ্য বর্ষায় সিলেবাসের বাইরে রাখবেন নতুবা গড্ডালিকাপ্রবাহে ভেসে যাবার প্রবল সম্ভাবনা। কিন্তু পালাবার পথ নাই, যম থুড়ি পাথর আছে পিছে। স্থানীয় মানুষদের পরামর্শ মেনে নিরাপদ শীতকালকেও বেছে নিতে পারেন রাঁচিদর্শনের জন্যে তবে সেসময় জলপ্রপাতের ডায়েট করা ক্ষীণকায়া রূপে আপনার চক্ষের তথা বক্ষের তৃষ্ণা ...

নাট্যপ্রযোজনার একটি সমান্তরাল ধারা- 'রবিনাটকের নাট্যকথা'

  নাটকের সাহিত্যগত দিকটি বাদ দিলে যে বিরাট অংশটি পড়ে থাকে, সেটি তার প্রকৌশলগত দিক। তাতে শুধু আলো বা মঞ্চসজ্জা নয়, আলোচিত হয় অভিনয়ের রীতি, কুশীলবদের বিশেষ প্রশিক্ষণ বা অনুশীলনের দিকটিও। নাটকের জ্যঁর-কে বুঝে নিয়ে সেইমত নাটকের নির্দেশনা বা প্রযোজনার বিষয়টিও এই প্রকৌশলের অন্তর্গত। নাটকের এই দুটি দিক একদিকে যেমন একে অন্যের পরিপূরক, তেমনি আবার অন্যদিকে এই দুই অংশের বিরোধ অনেক নাটকের অভিনয়যোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে, নাট্য নির্দেশনার বহু ছকভাঙা আদলের জন্ম হয়েছে।  রবীন্দ্রনাথের নাটক সমকালীন তথা প্রচলিত নাটকের তুলনায় গোড়া থেকেই স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্য নাট্যকারের ইচ্ছাকৃত বলে মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজের সৃষ্টির স্বাতন্ত্র্য রক্ষার ব্যাপারে শুরু থেকেই যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন। তবে এই স্বাতন্ত্র্যের মধ্যেও তার প্রথম দিকের নাটকগুলিতে বহমান সংস্কৃতির প্রতি একধরণের আনুগত্য দেখতে পাওয়া যায় যা তার পরবর্তীকালের নাটক অর্থাৎ শান্তিনিকেতন পর্বের নাটকে আশ্চর্যভাবে অনুপস্থিত। শান্তিনিকেতন পর্ব থেকেই প্রথাগত নাটকের থেকে রবীন্দ্রনাথের নাটকগুলির দূরত্ব বাড়তে থাকে। নাটকের সাধারণ ...